স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে পরস্পরের কঠোর সমালোচনা করেছেন সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে কেউ কেউ সাধারণ জীবনযাপন থেকে বিলাসবহুল জীবনে পৌঁছে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সরকারি দলের সদস্যরা। অন্যদিকে বিরোধী দল বাজেটের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, খেলাপী ঋণের কারণে অর্থনীতি দুরাবস্থার মধ্যে। সরকারের ৪ মাসে ঋণ বেড়েছে এক লাখ কোটি টাকা।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিষ্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, অনেকেই জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করছেন। কেউ আগে রিকশায় চলাফেরা করতেন, এখন জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে প্রাডো গাড়িতে চলেন। আমরা জুলাইয়ের সংগ্রাম করেছি, কিন্তু এটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করিনি। আমরা জুলাই দিয়ে স্বাধীনতাকে মুছে ফেলতে চাই না। স্বাধীনতা আমাদের হৃদয়ে আছে, জুলাইও আমাদের হৃদয়ে থাকবে। যারা এ চেতনাকে ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছেন, তাদের অতীত ও বর্তমান জীবনযাত্রার পার্থক্য জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি আরো বলেন, দেশের মানুষ বাজেটকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করলেও কেউ কেউ একে ‘চানাচুর মার্কা বাজেট’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের জন্য বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে সরকারি দলকেও জনগণের কাছ থেকে ফিরে আসতে হবে। তিনি দাবি করেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট ঋণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। মাত্র চার মাসে তা এক লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সরকার চার মাসেই দেশকে আরো এক লাখ কোটি টাকা ঋণের জালে বেঁধেছে।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আখতার হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতে একধরনের অরাজকতা চলছে। যেসব মালিক ব্যাংককে দেউলিয়া করেছে, লুটপাট ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের কাছে আবার ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী। তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতি চাপে রয়েছে। খেলাপি ঋণ অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনও প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনগণের রায়, গণভোটের সিদ্ধান্ত এবং সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেছেন, আমি ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আমরা মোট ঋণের ৬ শতাংশ খেলাপি হলে ঘাবড়ে যেতাম। কিন্তু সেখানে বাংলােেশ ৬১ শতাংশ। এতে ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল। ব্যাংকের বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ না নিলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশা করাটা ভুল। আমাদের ব্যাংকিং দক্ষতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সৎ ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছে না। আমাদের ডিফল্ট সিস্টেম। আমরা ব্যাংকের ডিফল্টের সংজ্ঞা পাল্টে দিয়েছি। আগে ছিল ৯০ দিন সুদ না দিলে ডিফল্টেড। কিন্তু এখন আমরা এক বছর সুদ না দিলে ডিফল্টেড বলি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুনলে মনে হয় সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ তার প্রতিফলন দেখতে পায় না। বাজেট প্রণয়নে জনগণ ও সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণও সীমিত। বাজেটের সাফল্য সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ানোর মাধ্যমে নয়, বরং সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটলে তা সফল বলে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, মেগা প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়নের সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছাবে। দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক অবকাঠামোর দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্ন রাখেন, দেশে হামে ৩০০ শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি না উঠলেও একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে কেন? তিনি বলেন, একটি মানবিক হাসপাতাল যেখানে ৭০০ বেডের মধ্যে ১৮০টি ফ্রি, প্রতিদিন ২৩টি নরমাল ডেলিভারি হয় এবং রোগী-স্বজনদের বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়, সেখানে মাত্র ৬টি শিশু মারা যাওয়ার অজুহাতে লাইসেন্স বাতিল করা হলো। অথচ দেশে যখন হামে ৩০০ শিশু মারা গেল, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন? ওই হাসপাতালে ২৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা সচিবের দেখা পাচ্ছেন না। এতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এমপিওভুক্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষক বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শিক্ষাখাতে ঘোষিত অগ্রাধিকারের তুলনায় বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা আন্দোলন ও শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের প্রজন্মগুলো জীবিত থাকা অবস্থায় আগামী ৫০ বছরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, আওয়ামী লীগ তিনটা জেনারেশনকে ইনজুর্ড করেছে। একটা হচ্ছে স্কুল, আরেকটা কলেজ আর একটা ইউনিভার্সিটি। এটা হল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা আন্দোলন পরে হাসিনার খেদাও আন্দোলন। এই তিনটা জেনারেশন জীবিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বোধহয় ফিরে আসার সম্ভাবনা নাই।
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গরিব মারা’ নয়, বরং ‘গরিব হয়রানির বাজেট’ বলে আখ্যা দিয়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, এই বাজেট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করেনি এবং শহীদ পরিবারের কান্নার প্রতিফলন এতে নেই। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বাজেটে জুলাই কমিশনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। শহীদ পরিবারের কষ্ট ও ত্যাগের বিষয়টিও উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বাজেট ঘোষণার আগেই ১৪টি ভোগ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও এলপিজি গ্যাসের মূল্য কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয়ও রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
দেশে মেগা প্রকল্পের আড়ালে মেগা দুর্নীতি চলছে বলে অভিযোগ করেন সালাউদ্দিন আইয়ুবী। তিনি বলেন, স্কুল ফিডিং ও খাল খননের মতো প্রকল্পেও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। ঋণ নিয়ে বড় বাজেট করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ন্যায় ও যাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় পরিচালনা করা গেলে সীমিত সম্পদ দিয়েও কাঙ্খিত উন্নয়ন অর্জন সম্ভব।
বাজেটে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খুব একটা ‘ভালো খবর’ নেই বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল বাতেন। তিনি বলেন, বড় বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা চাপানো হলে তা কতটা সুফল দেবে, তা প্রশ্নের বিষয়। ভ্যাটের প্রভাব ধনী ও দরিদ্রের ওপর সমানভাবে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ।
ডেস্ক রিপোর্ট: সরকারি চাকরিতে অযৌক্তিকভাবে ভাইভা নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যুব ফ্রন্ট।মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে সংগঠনের আহ্বায়ক রাশেদ শাহরিয়ার এই দাবি জানান। ...
স্টাফ রিপোর্টার: প্রতারণার মামলায় জামিন পেয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বিদিশা সিদ্দিক। তিনি প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ...
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: ফেসবুকে সুইসাইড নোট দেখে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা ও জাতীয় পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য মেঘমল্লার বসুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করেছেন শিবিরের কেন্দ্ ...
স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় পার্টির মহাসচিব, সাবেক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন।রোববার (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ৮টা ২৫ ...
সব মন্তব্য
No Comments