মানিক লাল ঘোষ:
আজ ১২ জানুয়ারি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক রক্তঝরা ও বেদনাবিধুর দিন। ১৯৩৪ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ব্রিটিশ শাসকরা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল বাংলার বিপ্লবীদের মুকুটহীন সম্রাট মাস্টারদা সূর্য সেনকে। ব্রিটিশদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি মাথা নত করেননি; বরং নিজের রক্ত দিয়ে লিখে গেছেন স্বাধীনতার অমর মহাকাব্য।
সূর্য সেনের জন্ম ১৮৯৪ সালে চট্টগ্রামের রাউজান থানায়। পেশায় ছিলেন একজন সাধারণ শিক্ষক, কিন্তু মনের গভীরে লালন করতেন পরাধীনতার শিকল ভাঙার অদম্য স্বপ্ন। তাঁর নম্র স্বভাব আর গভীর জ্ঞানের কারণে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় ‘মাস্টারদা’। তিনি বিশ্বাস করতেন, সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া ব্রিটিশদের এ দেশ থেকে তাড়ানো সম্ভব নয়।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক মাইলফলক। মাস্টারদার নেতৃত্বে 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'র একদল তরুণ বিপ্লবী চট্টগ্রামের পুলিশ ও লহ্মী (সঠিক বানান: লাইন্স) অস্ত্রাগার দখল করে নেন। চারদিনের জন্য চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ঘোষণা করে সেখানে স্বাধীন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এই দুঃসাহসিক অভিযান বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, ব্রিটিশ শক্তির অপরাজেয় দম্ভ চূর্ণ করা সম্ভব।
অস্ত্রাগার দখলের পর জালালাবাদ পাহাড়ে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে বিপ্লবীদের যে অসম যুদ্ধ হয়েছিল, তা ইতিহাসে বিরল। মাত্র কয়েকশ তরুণের অদম্য সাহসের সামনে সেদিন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল ব্রিটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। সেই যুদ্ধে শহীদ হন অনেক তরুণ বিপ্লবী, যা বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধীনতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৩৩ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। কারান্তরালে তাঁর ওপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন। কথিত আছে, ফাঁসির আগে ব্রিটিশ সৈন্যরা হাতুড়ি দিয়ে তাঁর দাঁত ও হাড় ভেঙে দিয়েছিল যাতে তিনি জয়ধ্বনি দিতে না পারেন। কিন্তু নিথর দেহের আড়ালে যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, তা ছিল অবিনশ্বর।
মৃত্যুর আগে সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন:
"আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে আমি আমার প্রাণ উৎসর্গ করিলাম। এই শুভ মুহূর্তে তোমাদের জন্য আমি কী রাখিয়া গেলাম? আমার এক সুন্দর স্বপ্ন— স্বাধীনতার সোনালী স্বপ্ন।"
আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন মাস্টারদা সূর্য সেনকে স্মরণ করি, তখন কেবল তাঁর নাম নয়, তাঁর দেশপ্রেম ও আদর্শকে ধারণ করা বেশি জরুরি। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত ও অনন্ত সিংহের মতো অসংখ্য বিপ্লবীকে যিনি তৈরি করেছিলেন, সেই মহান শিক্ষকের ঋণ আমরা কখনো শোধ করতে পারব না।
মাস্টারদা সূর্য সেনের প্রয়াণ দিবসে এই বীর বিপ্লবীর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
-লেখক: মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন এর সাবেক সহ সভাপতি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
আবুল বাশার মিরাজ:নদী আমাদের সভ্যতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। “নদীমাতৃক বাংলাদেশ” নামটি কেবল কাব্যিক নয়, বাস্তবেরও প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই নদীগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি বিপ ...
লুতুব আলি:“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” – রবীন্দ্রনাথের এই অমর আহ্বানকে বুকে নিয়েই শনিবার, ৯ মে ২০২৬, বিশ্বকবির ১৬৫তম জন্মজয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে চলে ...
এ এম ইমদাদুল ইসলাম:রাত তখন অনেকটা গভীর। ঢাকার রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে, কিন্তু গুলিস্থান বাসস্ট্যান্ডে এখনো মানুষের কোলাহল রয়ে গেছে। সেই ভিড়ের মাঝেই ছোট্ট রাকিব দৌড়ে বেড়াচ্ছে কখনো যাত্রীকে ...
মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন:বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পট ...
সব মন্তব্য
No Comments