হাইটিনা, জাপান্টিনা কিংবা নরওয়েন্টিনা—যে নামেই ট্রল করা হোক না কেন, আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হওয়ার পরেও আমি সবসময় ব্রাজিলের বিজয় কামনা করেছি। কারণ বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার এই মহোৎসব ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ছাড়া জমতেই পারে না। কিন্তু দুনিয়ার কোটি কোটি সমর্থককে হতাশ করে ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে শেষ ১৬-এর লড়াই থেকে। রাউন্ড অব ৩২-এ জাপানের বিরুদ্ধে দুরন্ত কামব্যাকে ব্রাজিল জয়ী হলেও নরওয়ের বিরুদ্ধে শেষ রক্ষা হলো না। হালান্ড ঝড়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের এই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে। দলটির এই বিদায় যাত্রা ব্রাজিলিয়ানদের যতটা না কষ্ট দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছে দুনিয়ার কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্ত। দেশের কোথাও কোথাও আত্মহত্যার খবরও পাওয়া গেছে, যদিও সেটাকে আমি অতিরিক্ত পাগলামি ছাড়া কিছুই বলব না।
প্রশ্ন হলো, নরওয়ে এমন কী শক্তি পেল যে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ আসরে ফিরেই টপ ফেভারিট ব্রাজিলকে পরাস্ত করে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে জয়ী হলো! ব্রাজিল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও আর্লিং হালান্ডকে থামাতে পারল না। সুযোগ অবশ্য ব্রাজিলও কম পায়নি। খেলার শুরুতে পেনাল্টি, একেবারে শেষ সময়েও পেনাল্টি পেল; মাঝে বহুবার আক্রমণ করেছে, কিন্তু নরওয়ের গোলকিপার ওন্ড্রে নাইল্যান্ড রীতিমতো মানবপ্রাচীর তৈরি করে রেখেছিলেন। শেষ দিকে নেইমার মাঠে না নামলে তো ব্রাজিল গোলের দেখাই পেত না। অন্যদিকে ম্যাচের মাত্র তিন মিনিটের মাথায় অফসাইডের বাঁশি না বাজলে নরওয়ে আরও শক্তিশালী হতে পারত, কারণ বল প্রথম তারাই জালে জড়িয়েছিল। ফলে পুরো ম্যাচে নরওয়ের ফুটবলারদের দাপটই স্পষ্ট ছিল।
গত ৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় টেক্সাসের রাতের আকাশে শুধুই ছিল বিষাদের ছায়া। গ্যালারিতে হলুদ-সবুজ সমুদ্র স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। অবিশ্বাস আর অশ্রুজল নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সেলেসাও ভক্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বহুল প্রতীক্ষিত 'হেক্সা মিশন' জয়ের স্বপ্ন এক লহমায় চূর্ণ করে দিল উত্তর ইউরোপের লড়াকু দেশ নরওয়ে। হাইভোল্টেজ এই ম্যাচে ফুটবল বিশ্ব দেখল ওসলোর ভাইকিংদের এক অবিশ্বাস্য রূপকথার মহাকাব্য। শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি নাটক আর রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে ২-১ গোলের ব্যবধানে বিশ্বকাপের শেষ ১৬ থেকেই বিদায় নিতে হলো ব্রাজিলকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই চেনা ছন্দে আক্রমণ শানাতে থাকে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস আর রদ্রিগোর গতিতে নরওয়ের রক্ষণভাগ তখন তটস্থ। ব্রাজিলের সেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের মুখে প্রথমার্ধেই লিড নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আসে সেলেসাওদের সামনে। নরওয়ের ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে চরম খেই হারিয়ে ফেলে ব্রাজিল। নরওয়ের গোলরক্ষক ওন্ড্রে নাইল্যান্ডের অতিমানবীয় সেভে ব্রাজিলের প্রথম পেনাল্টি মিসের ধাক্কা পুরো স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দেয়। গোলশূন্যভাবে এবং পেনাল্টি মিসের একরাশ হতাশা নিয়ে প্রথমার্ধ শেষ করে ব্রাজিল। এই মিস যেন ব্রাজিল ভক্তদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল ঠিক ৪০ বছর আগে, '৮৬-র বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে কিংবদন্তি জিকোর সেই অভিশপ্ত পেনাল্টি মিসের স্মৃতিতে। চার দশক পর আবারও প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসের ভূত তাড়া করল ব্রাজিলকে।
পেনাল্টি মিসের ধাক্কা এবং নরওয়ের ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স ভাঙতে না পেরে দ্বিতীয়ার্ধে নিজের শেষ অস্ত্রটি ব্যবহার করতে বাধ্য হন ব্রাজিলের কোচ। দলের প্রাণভোমরা, পুরোপুরি ফিট না থাকা নেইমারকে শেষ পর্যন্ত ৭০ মিনিটের মাথায় মাঠে নামানো হয়। অনেক সমর্থক কোচের এই সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বললেও অনেকের মন্তব্য ছিল—তাকে আরও আগেই নামানো উচিত ছিল। তবে নেইমার মাঠে নামতেই ব্রাজিলের আক্রমণের ধার বাড়ে। খেলার নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত দুই দলই সমানে সমানে লড়াই করে যাচ্ছিল। ম্যাচের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই আসে সেই স্তব্ধ করে দেওয়া মুহূর্ত। ঠিক ৯০তম মিনিটে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড এক অবিশ্বাস্য গোল করে বসেন! গোলবক্সের বাইরে মাঝখান থেকে খানিকটা বাঁ দিকে বল রিসিভ করে বাঁ পায়ের এক দুরন্ত শটে বল জালে জড়ান তিনি। পুরো স্টেডিয়ামকে নিস্তব্ধতায় ডুবিয়ে নরওয়ে এগিয়ে যায় ১-০ ব্যবধানে। মনে হচ্ছিল ব্রাজিলের বিদায় এবার নিশ্চিত।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে রেফারি যখন অতিরিক্ত সময় (ইনজুরি টাইম) ঘোষণা করলেন, ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ব্রাজিল তখন অল-আউট আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অতিরিক্ত সময়ের খেলায় নরওয়ের বক্সে ফাউলের শিকার হন ভিনিসিয়ুস। রেফারি আবারও পেনাল্টির বাঁশি বাজান। চরম স্নায়ুচাপের মুখে পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন নেইমার। এবার আর কোনো ভুল হয়নি; নিখুঁত শটে গোল করে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান তিনি। গ্যালারিতে তখন সাম্বার বুনো উল্লাস। কিন্তু ব্রাজিলের সেই আনন্দ বেশি সময় স্থায়ী হতে দেয়নি ভাইকিংরা। অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে নরওয়ের জয় সুনিশ্চিত করেন আর্লিং হালান্ড। আপ্রাণ চেষ্টা করেও হালান্ডের শটের প্রচণ্ড গতি ও টেকনিকের কারণে বল গোললাইন অতিক্রম করা থেকে রক্ষা করতে পারেননি ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসন বেকার। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের কফিনে এটাই ছিল শেষ পেরেক।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে অশ্রুসিক্ত চোখে আকাশ পানে চেয়ে রইলেন নেইমার-ভিনিসিয়ুসরা। ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়ে বীরের বেশে মাঠ ছাড়ে নরওয়ে। প্রথমার্ধে পেনাল্টি হেলায় হারানোর নির্মম খেসারত দিয়ে আরও একবার ট্র্যাজিক হিরো হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
এই জয়ের জন্য নরওয়েজিয়ানদের অভিনন্দন। কিন্তু বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের জয়টা বড্ড প্রয়োজন ছিল। বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার এই আসরকে আরও জমকালো করতে ব্রাজিলের বিজয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু ব্রাজিল তা পারল না, ফলে বিশ্বকাপের এই আসরের অর্ধেক আনন্দ এখানেই শেষ হয়ে গেল। আজ যদি কোনো অঘটনে আর্জেন্টিনা মিশরের কাছে হেরে বসে, তাহলে বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনা একেবারেই ম্লান হয়ে যাবে। তাই যারা 'মিশরজিল' হয়ে আর্জেন্টিনার পরাজয় কামনা করছেন, তারা একবার ভেবে দেখুন—পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো, বাতিস্তুতা কিংবা ওর্তেগার উত্তসূরীদের ছন্দময় খেলার জাদু ছাড়া এই বিশ্বকাপ সত্যিই কি জমবে!
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
।।।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে শেষ ১৬-তে বিজয়ের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কেবল আমি নয়, শ্বাসরুদ্ধকার অবস্থায় ছিলেন গোটা দুনিয়ার কোটি কোটি ভক্ত। হঠাৎ টর্নেডোর গতিতে ফিরে এলো ম ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার সাংবিধানিক প্রতীক। সেই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধী ...
বিল্লাল বিন কাশেম:একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তার মানবসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই থাকুক না কেন, দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন স ...
আফসানা আরেফিন:আমরা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা আপাত-বিরোধিতার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম কিউরেট করা জীবন এবং করপোরেট সংস্কৃতির পারফরম্যান্স রিভিউ সবকিছু মিলে ...
সব মন্তব্য
No Comments