অলিগলিতে বুকসমান পানি, স্থবির জনজীবন
মোহাম্মদ বিন কাশেম জুয়েল:
ঢাকা শহর যেন আবারও নিজের পুরোনো অসহায় চেহারায় ফিরে গেছে। কয়েক ঘণ্টার টানা মুষলধারে বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও বুকসমান পানি জমে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আধুনিকতার মোড়কে আবৃত এই মহানগরীর বাস্তব চিত্র যেন বর্ষার এক প্রবল ধাক্কায় উন্মোচিত হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাট, অলিগলি, ফুটপাত, বাসাবাড়ি, দোকানপাট—সবখানেই পানি আর পানি। মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়।
সকাল থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক দ্রুত পানিতে ডুবে যায়। বিশেষ করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো, শান্তিনগর, মালিবাগ, বাড্ডা, খিলগাঁও, তেজগাঁও, ফার্মগেট, পুরান ঢাকা ও ধানমন্ডির বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অলিগলিতে জমে থাকা পানিতে মানুষের চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় রিকশা ও ছোট যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।
রাজধানীর বহু এলাকার মানুষ অভিযোগ করেছেন, সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যাওয়ার সমস্যা নতুন নয়। বছরের পর বছর একই পরিস্থিতি চললেও কার্যকর কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। উন্নয়নের নানা বড় বড় প্রকল্পের কথা শোনা গেলেও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো ঢাকার প্রধান সংকটগুলোর একটি।
বৃষ্টির পানিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। বস্তি ও নিচু এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার তাদের বিছানা, কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বিপাকে পড়েছে। কোথাও কোথাও রান্না বন্ধ হয়ে গেছে। শিশুরা পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। পানিবাহিত রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে।
এদিকে, সড়কে পানি জমে থাকায় যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে গাড়ি। অফিসগামী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদ্যালয় ও কলেজে যেতে পারেনি। কেউ কেউ আবার জুতা হাতে নিয়ে পানির মধ্যে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন।
ঢাকার অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় উঠে আসে। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। খোলা ম্যানহোল ও ড্রেনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও মানুষকে বুকসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে, কোথাও আবার মোটরসাইকেল ও গাড়ি বন্ধ হয়ে রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলাধার কমে যাওয়ার কারণেই রাজধানীতে সামান্য ভারী বর্ষণেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। একসময় ঢাকায় অসংখ্য খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার ছিল, যা অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরিয়ে নিতে সাহায্য করতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাল ভরাট ও দখলের ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়ে গেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, কেবল রাস্তা বড় করলেই একটি শহর বাসযোগ্য হয় না; প্রয়োজন কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ এবং টেকসই নগর পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বর্ষা এলেই ঢাকার মানুষকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে মানবিক দৃশ্যও চোখে পড়ে। কোথাও তরুণেরা পানিতে আটকে পড়া মানুষকে সাহায্য করছেন, কোথাও স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে ড্রেন পরিষ্কার করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন। দুর্যোগের মধ্যেও মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতার এই চিত্র কিছুটা আশার আলো দেখায়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—কবে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে ঢাকা? কোটি মানুষের এই শহর কি প্রতি বর্ষায় একইভাবে পানির নিচে ডুবে থাকবে? নাগরিকদের ভোগান্তি কি কেবল সংবাদ শিরোনাম হয়েই থাকবে?
রাজধানীর বাসিন্দারা এখন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চান। তারা চান এমন একটি নগরব্যবস্থা, যেখানে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে জীবন থমকে যাবে না। যেখানে শিশুদের স্কুলে যেতে ভয় পেতে হবে না, কর্মজীবী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হবে না, আর নিম্ন আয়ের মানুষকে পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে না।
ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই শহর। অথচ প্রতিবার বর্ষায় নগরবাসীর অসহায়ত্ব যেন প্রমাণ করে দেয়, উন্নয়নের বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে এখনও কত বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে।
মুষলধারে বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া এই ঢাকা যেন আমাদের নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতি বারবার সতর্ক করছে—অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ ধ্বংসের ফল একদিন ভয়াবহ হয়ে উঠবে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে।
ঢাকার মানুষ ক্লান্ত, কিন্তু তারা এখনো আশাবাদী। তারা বিশ্বাস করতে চায়—একদিন এই শহর সত্যিকারের বাসযোগ্য হবে। বর্ষার বৃষ্টি তখন আর আতঙ্ক নয়, হয়ে উঠবে প্রশান্তির প্রতীক। কিন্তু সেই দিনের জন্য প্রয়োজন সৎ পরিকল্পনা, কার্যকর উদ্যোগ এবং নাগরিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা।
আজকের জলাবদ্ধ ঢাকা তাই কেবল একটি নগরীর সংকট নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন ভাবনা, পরিকল্পনা ও দায়িত্ববোধেরও এক কঠিন পরীক্ষা।
এ এম ইমদাদুল ইসলাম:বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো গ্রামীণ অর্থনীতি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মানুষ গ্রামে এবং ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস ...
লুতুব আলি:ভাষা যখন মায়ের মতো বুক দিয়ে আগলে রাখে, তখন তার নাম বাংলা। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই ভাষাকেই বারবার ‘সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, ইউনেস্কোর এক পর্যবেক্ষণে উচ্চারণের ...
বিল্লাল বিন কাশেম:বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে। সংবাদপত্রের পাতা, টেলিভিশনের টকশো, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই অর্থনীতি একটি আলোচিত ...
লুতুব আলি:২০০ বছর ধরে চিড়িয়াখানার সংজ্ঞা ছিল একটাই - খাঁচা। বন্যপ্রাণীকে ধরে এনে মানুষকে দেখানো। লন্ডন চিড়িয়াখানা এবার সেই সংজ্ঞা ভেঙে দিল। অপারেশন থিয়েটারের সার্জনের ছুরি থেকে এবার সোজা দর্শকের ...
সব মন্তব্য
No Comments