ঋণখেলাপী ইস্যুতে মুখোমুখী সরকার ও বিরোধী দল

সংসদে ঋণগ্রস্থ সংসদ সদস্য থাকলেও ঋণখেলাপী নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ : 18 Jun 2026
সংসদে ঋণগ্রস্থ সংসদ সদস্য থাকলেও ঋণখেলাপী নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে ঋণখেলাপী ইস্যুতে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য রেখেছেন সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা। বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংসদে ঋণগ্রস্থ সংসদ সদস্য থাকলেও ঋণখেলাপী নেই। এরআগে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আগেই ঋণখেলাপীদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সংসদে ঋণ খেলাপিদের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এই সংসদ ঋণখোলীদের বলে মন্তব্য করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিষ্টার রুমিন ফারহানা।  

গতকাল বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিষ্টার রুমিন ফারহানা ঋণখেলাপী ইস্যুতে বিতর্কের সূত্রপাত করেন। এরপর এই ইস্যুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। রুমিন ফারহানার বক্তব্য এক্সপাঞ্চ করার দাবি জানান সরকারি দলের সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সংসদের কোনো সদস্য ঋণখেলাপি নেই। যারা আছেন তারা ঋণগ্রস্ত হতে পারেন। আইন অনুযায়ী, যেমন রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডারসহ অন্যান্য বিধিমালায়, যদি কেউ আদালত কর্তৃক ঋণখেলাপি হিসেবে সাব্যস্ত বা ঘোষিত হন, তবে তিনি অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। এমপি পদে মনোনয়ন দিতে পারেন না। সেটি স্পষ্ট বিধান। তিনি আরো বলেন, নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসার অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয় ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু ঋণখেলাপি নন। এখন কেউ যদি দাবি করেন যে এই সংসদে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই আইনগত ব্যাখ্যার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাদের কারো বিরুদ্ধে ব্যাংক বা অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মামলা থাকলেও, সেগুলো হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আদালত থেকে নিষ্পত্তির পর এবং বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর তিনি আর ঋণখেলাপি থাকেন না। এবং তারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন। সুতরাং এটিকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলা সঠিক নয় এবং এটি মানহানিকর বক্তব্য। আমি মনে করি, এটি এক্সপাঞ্জ করা উচিত। 

এরআগে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে যেমন ঋণ খেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি, নির্বাচনের পরও সে অবস্থান থেকে সরে আসিনি। আমার প্রথম সংসদীয় বক্তব্যেই আমি উল্লেখ করেছি, এই সংসদের অনেক সদস্যের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। তবে সংসদ সদস্যদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমি কারও নাম প্রকাশ করিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদে যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঋণ খেলাপি সদস্য থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে। জনগণ মনে করতে পারে, এই সংসদে ঋণ খেলাপিদের উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে সরকার দলীয় সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে এমন আলোচনা জনপরিসরে আরো বেশি গুরুত্ব পাবে। জনগণের প্রত্যাশা হলো জাতীয় সংসদ হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার প্রতীক। তাই ঋণ খেলাপির মতো গুরুতর বিষয়গুলো নিয়ে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে খোলামেলা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

সর্বশেষ পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে ঋণ পুনঃতফসিল (রিশিডিউলিং) করা হয় এবং উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে নির্বাচন করা হয়, তা সবারই জানা। টিআইবি সম্প্রতি তথ্য দিয়েছে, চলতি সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। তিনি বলেন, আমি যেহেতু একজন আইনজীবী, নির্বাচনের আগে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে কীভাবে রিশিডিউলিং করা হয়, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। সিআইবির (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) নাম আসার পর কীভাবে রিট পিটিশন দাখিল করে তা স্টে (স্থগিত) করে ইলেকশন করা হয় এবং এরপর আবারো সুদ দেওয়া বন্ধ করা হয়, সেটাও আমরা ভালো বুঝি।

সরকারি দলের সদস্য ফজলুল হক মিলন বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সবাই বলছেন যে এই সংসদ একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংসদ। অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে, একটি সর্বজন গ্রহণযোগ্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংসদ গঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আমরা সম্মানিত হয়েছি, দেশবাসীও সম্মানিত হয়েছে। কিন্তু ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা বক্তব্য রাখার সময় হয়তো খেয়াল করি না, কিন্তু অবচেতন বা সচেতন মনে এমন কিছু কথা সংসদে উচ্চারণ করি, যা আমাদের নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে, মর্যাদাকে খাটো করে। ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হচ্ছে’ এমন মন্তব্য করা হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

উচ্চাভিলাষী বাজেট দেশকে নতুন উচ্চতায় নেবে : বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে আইন মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট একটি স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী বাজেট, যা বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করবে। একসময় বাজেট উপস্থাপনের পর ‘গরিব মারার বাজেট’ কিংবা ‘বড়লোকের বাজেট’ বলে সমালোচনা করা হতো। কিন্তু এবারের বাজেটকে ঘিরে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কারণ এই বাজেট গরিব, মধ্যবিত্ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় এ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি কোনও একদিনের চিন্তার ফল নয়, বরং দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলন।

বাজেটকে স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী বলে সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী বলেন, যে জাতি স্বপ্ন দেখতে পারে না, সে জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। উচ্চাভিলাষ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড, উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সরকার বাস্তবমুখী ও উন্নয়নবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর-সুবিধা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও এতে প্রতিফলিত হয়েছে। এ বাজেট উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার রূপরেখা এতে তুলে ধরা হয়েছে।

এখন কি বলবো, সবার আগে বগুড়া : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেছেন, নিন্দুকেরা বলে, একসময় বলা হতো সবার আগে গোপালগঞ্জ। এখন কি আমরা বলব সবার আগে বগুড়া? আমরা এই বাংলাদেশ চাই না। সবার আগে বাংলাদেশ হলে, প্রতিটা প্রান্তের মানুষের জন্য সমান ধরনের বাজেট থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, ইদানীং নিন্দুকেরা বলে, নতুন একটা উপজেলার আবির্ভাব ঘটেছে—এটাকে নবাবী উপজেলা বলা হচ্ছে। আমি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কথা বলতেছি। যেখানে অন্যান্য এলাকায় বাজেট পায় না, সেখানে এক উপজেলায়, কি এক ক্যারিশমাটিক মিরাকল সেখানে ৭৬ কোটি টাকা চলে যায়।

প্রতিরক্ষা খাতের বাজেটের বিষয়ে আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ ও অস্ত্র থাকত, আধুনিক অস্ত্র থাকলে আমাদের লোক দিয়ে, একক কর্তৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতাম। রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান যুদ্ধের সময় ভারতের পক্ষ থেকে একটা ভাঙা ওয়ারলেস দেওয়া হয়েছিল। রাগ করে ফেলে দিয়ে ভারতীয় কমান্ডোকে তিনি বলেছিলেন, অস্ত্র যখন দিবা, সরঞ্জামাদি যখন দিবা, তখন এমন জিনিস দাও, যেটা ফাংশন করে, ডিসফাংশানাল দিও না, এটা আমাদের বাধাগ্রস্ত করে। তিনি আরো বলেন, আমাদের মিয়ানমারে সীমান্তে যুদ্ধ চলমান আছে। পার্বত্য তিনটি জেলায় তিনটা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, কু-কি চিনের বিরুদ্ধে আর্মির দুইটা ডিভিশন কাজ করছে। তাই প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সম্পর্কিত খবর

;