ব্রিকস সম্মেলন প্রসঙ্গে সিপিবির বিবৃতি, বহুকেন্দ্রিক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান

প্রকাশ : 09 Sep 2026
ব্রিকস সম্মেলন প্রসঙ্গে সিপিবির বিবৃতি, বহুকেন্দ্রিক ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান

ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্ব পরিমণ্ডলে এককেন্দ্রিক আধিপত্য ও যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সকল রাষ্ট্রের সমঅধিকার, মর্যাদা ও সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সময় এসেছে বলে মনে করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় একটি বহুকেন্দ্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।


১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন আজ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন থেকে এই প্রস্তাবকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনগণ ও পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষের পক্ষাবলম্বনের বিপুল সুযোগ রয়েছে।


বিবৃতিতে সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান এককেন্দ্রিক আধিপত্যমূলক বিশ্ব ব্যবস্থার পরিবর্তে বহুকেন্দ্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিকসের মতো উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে আরও আন্তরিক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। একইসাথে বাংলাদেশের সামনে কোনো ধরনের যুদ্ধমুখী সামরিক জোটে শামিল হওয়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে ব্রিকসসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক উদ্যোগে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে।


নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান বিশ্ব এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট এবং সামরিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি অতিক্রম করছে। যুদ্ধ, সামরিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বৈষম্য এবং পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতির দেশের জনগণকে। এই পরিস্থিতিতে উত্তর-উপনিবেশিক, উন্নয়নশীল ও উদীয়মান বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


ব্রিকসকে এমন একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের বিষয়ে সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজেদের আরও জোরদার ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।


তারা বলেন, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এখনও তাদের জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় অপর্যাপ্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জোরদার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ব্রিকস একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।


বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারনির্ভরতা, একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং অসম বাণিজ্য ব্যবস্থার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো নানা ধরনের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ জনগণের স্বার্থে আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা যেন নতুন কোনো আধিপত্য বা শক্তিকেন্দ্রের জন্ম না দেয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করেন সিপিবি নেতৃবৃন্দ।


তারা বলেন, গাজা, ইরান, ইয়েমেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতে কোটি কোটি মানুষ ও মানবতা আজ বিপর্যস্ত। যুদ্ধ ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধান, জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস দেশগুলোর আরও দৃঢ় ভূমিকা প্রয়োজন। একইসাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সামরিক ব্যয় কমিয়ে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও মানবিক উন্নয়নে সম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।


বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের সাথে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, শ্রমবাজার, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। কোনো শক্তিকেন্দ্রের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা তৈরি না করে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।


নেতৃবৃন্দ সরকারের প্রতি জাতীয় স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং শান্তির পক্ষে একটি সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক ব্লকের অংশ না হয়ে এবং কোনো পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশীদার না হয়ে বাংলাদেশকে নিজস্ব স্বার্থ ও অবস্থান থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।


সম্পর্কিত খবর

;