২০২৬-২৭ অর্থবছর

দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু

প্রকাশ : 10 Jun 2026
দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু


স্টাফ রিপোর্টার: অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করবেন। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও প্রথম বাজেট। 


অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের এ কাঠামোতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ থেকে ৫ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 


চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। সে তুলনায় নতুন বাজেট প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েছিলেন। 


মানবসম্পদে জোর, বাড়ছে শিক্ষা-স্বাস্থ্য বরাদ্দ

এবারের বাজেটে অবকাঠামোর তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে। এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন কর্মসূচি

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।


এডিপি ও ব্যবসা সহজীকরণ

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এবারের বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার উদ্যোগ। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে। 


চ্যালেঞ্জ ও প্রতিক্রিয়া

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।


পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।


অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ‘আওয়ামী লীগের ১৫ বছর ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছর শেষে বিএনপি যে একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে, ঠিকঠাক করার প্রতিফলন থাকবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে’। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর এটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। 


সম্পর্কিত খবর

;