মুক্তার হোসেন নাহিদ:
মায়ামির রাতের আকাশে নীল-সাদার সমারোহ। হার্ড রক স্টেডিয়ামে "আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা" প্রতিধ্বনি। দুনিয়াজুড়ে পর্দার সামনে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠেও একই আওয়াজ। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ম স্থানে থাকা বিশ্বচ্যাম্পিয়ান আর্জেন্টিনার পাশে অতলান্তিক মহাসাগরের বুক চিরে আসা আফ্রিকান কেপ ভার্দে দাঁড়াতেই পারবে না। হেসেখেলেই শেষ-১৬ তে যাবে আলবিসেলেস্তেরা। খেলার ২৯ মিনিটের মাথায় লিওনেল মেসির গোলে তারই উচ্ছ্বাস দেখা গেল দুনিয়াজুড়ে। কিন্তু হঠাৎ করে স্তব্ধ হয়ে গেল হার্ড রকের গ্যালারি, আতঙ্কে হিম হয়ে এলো দুনিয়ার সকল আর্জেন্টাইন সমর্থকদের শরীর। 'ব্লু শার্কসের' বিষাক্ত কামড়ে বারবার রক্তাক্ত হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অহংকার। গ্যালারিতে স্তব্ধ প্রার্থনা, মাঠের কোণে মেসির শূন্য দৃষ্টি। পেনাল্টি শুটআউটের যমদূত যখন আলবিসেলেস্তেদের দরজায়, ঠিক তখনই খেলার ১তম মিনিটে এক ফোঁটা ভাগ্যের ছোঁয়া। নরকের দরজা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরল আর্জেন্টিনা। ১২০ মিনিটের এক শ্বাসরুদ্ধকর মহাকাব্য শেষে আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। কিন্তু হৃদকম্পন থামিয়ে দেওয়া এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মতোই মায়ামিতে আফ্রিকান ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের নান্দনিক খেলা সারা বিশ্ব মনে রাখবে বহুদিন। খেলা শেষে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে তাদের স্যালুট জানানো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দৃশ্য সেটাই মনে করিয়ে দেয়।
ম্যাচের শুরুটা ছিল যেন এক টুকরো কবিতার মতো। ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পা থেকে যখন বলটি বাতাসে ডানা মেলল, মায়ামির গ্যালারি তখন এক পরম আচ্ছন্নতায়। বলটি যেন কোনো অদৃশ্য মায়া জালে আটকে গেল লিওনেল মেসির পায়ে। ডিফেন্ডারদের চোখের পলক ফেলার সুযোগ না দিয়ে বাঁ পায়ের এক মাপা শটে যখন বল জালে জড়াল, তখন মনে হয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য এটি হয়তো আরেকটি সহজ জয়ের রাত। বিশ্বকাপে নিজের রেকর্ড ২০তম গোলটি করে মেসি যখন শূন্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়ে দিলেন, তখন কে জানত - আফ্রিকার এই 'ব্লু শার্কস' বা নীল হাঙররা একটু পরেই কামড়ে ধরবে আর্জেন্টিনার হৃৎপিণ্ড!
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৯ মিনিটে যখন ডেরয় দুয়ার্তে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে বালির বাঁধের মতো ভাসিয়ে দিয়ে সমতা ফেরালেন, ফ্লোরিডার আকাশ ভেঙে যেন এক পশলা নীরবতা নেমে এলো। এরপর শুরু হলো এক অতিমানবীয় প্রাচীরের গল্প। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী বাজপাখি ভোজিনহা একের পর এক ১০টি নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে ম্যাচটিকে টেনে নিয়ে গেলেন অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুযুদ্ধে।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটের সমতা শেষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো খেলা নাটকীয়তায় উন্মাদনায় রূপ নেয়। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের এক চোখ ধাঁধানো বুলেট ভলি! গোল! ২-১ গোলে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। ডাগআউটে কোচ স্কালোনির মুখে স্বস্তির হাসি। কিন্তু সেই হাসি স্থায়ী হলো মাত্র ১ মিনিট। ১০৩ মিনিটে কেপ ভার্দের সিডনি লোপেস কাব্রাল বক্সের অনেক বাইরে থেকে নেওয়া এক অবিশ্বাস্য, জাদুকরী বাঁকানো শট 'দিবু' মার্তিনেসকে পুরোপুরি বোকা বানিয়ে জালে জড়িয়ে দিলো। ২-২! ফুটবল বিশ্ব তখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনের সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। মনে হচ্ছিল পেনাল্টি শুটআউটের লটারিতেই ফয়সালা হবে এই মহাযুদ্ধ।
কিন্তু ১ মিনিটে লিওনেল মেসির নেওয়া এক বিষাক্ত কর্নার কিকে মাথা ছুঁইয়েছিলেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। কিন্তু বলটি গোললাইন অতিক্রম করার ঠিক আগের মুহূর্তে কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার ডিনি বোর্গেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। ফুটবলের নিষ্ঠুরতম এই 'আত্মঘাতী গোল'! যে ডিনি পুরো ম্যাচ বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন, তিনিই হয়ে গেলেন ট্র্যাজিক হিরো। আর ৩-২ গোলের এই নাটকীয় জয়ে বুক থেকে এক বিশাল পাথর নেমে গেল আর্জেন্টিনার।
এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ম্যারাডোনার উত্তরসূরীদের বিজয় হলে রীতিমতো হৃৎপিণ্ডে কামড় ধরেছিল অতলান্তিক মহাসাগরীয় দ্বীপুঞ্জের বাসিন্দারা। কেপ ভার্দের ফুটবলাররা যখন অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়ছিলেন, গ্যালারির আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও তখন দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছিলেন এই বীরদের।
-লেখক: একজন সাংবাদিক ও রাজনীতিক।
।।।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে শেষ ১৬-তে বিজয়ের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কেবল আমি নয়, শ্বাসরুদ্ধকার অবস্থায় ছিলেন গোটা দুনিয়ার কোটি কোটি ভক্ত। হঠাৎ টর্নেডোর গতিতে ফিরে এলো ম ...
আতিকুল ইসলাম টিটু:জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার সাংবিধানিক প্রতীক। সেই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধী ...
।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।হাইটিনা, জাপান্টিনা কিংবা নরওয়েন্টিনা—যে নামেই ট্রল করা হোক না কেন, আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হওয়ার পরেও আমি সবসময় ব্রাজিলের বিজয় কামনা করেছি। কারণ বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার ...
বিল্লাল বিন কাশেম:একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তার মানবসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই থাকুক না কেন, দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন স ...
সব মন্তব্য
No Comments