পচন যখন গোড়ায়: একটি ডিম হাতিয়ে নেওয়া ও আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দেউলিয়াত্ব

প্রকাশ : 11 Jul 2026
পচন যখন গোড়ায়: একটি ডিম হাতিয়ে নেওয়া ও আমাদের সামষ্টিক নৈতিক দেউলিয়াত্ব

নিকোলাস বিশ্বাস:

যেকোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে হতাশাজনক, ক্ষোভমিশ্রিত এবং নির্মম সত্য আর কী হতে পারে? কিন্তু এই গভীর হতাশা তো কোনো আকস্মিক শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নি। এটি আমাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবন, আমাদের চারপাশের চেনা মানুষ এবং আমাদের নিজেদেরই তৈরি এক সম্মিলিত অবক্ষয়ের অমোঘ ফসল। আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুর মেগা-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি, হাজার কোটি টাকার ব্যাংক লোপাট নিয়ে টকশোতে কিংবা চায়ের কাপে ঝড় তুলি। কিন্তু আমাদের সমাজের একেবারে ভেতরটা, সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব যে কতটা জীর্ণ এবং ঘুণপোকা-ধরা হয়ে গেছে, তা আমরা কৌশলে এড়িয়ে যাই। আমরা ভাবি, দুর্নীতি কেবল ওপরের স্তরের মানুষের একচেটিয়া অধিকার। অথচ আসল সত্য হলো, ক্ষমতার ক্ষুদ্রতম সুযোগ পেলেও আমাদের সাধারণ নাগরিকের বড় অংশই সেই একই অনৈতিকতার চর্চা করে, যা বড় বড় লুটেরারা করে থাকে।


ডিম চুরির উপাখ্যান, একটি জাতীয় চরিত্রের দর্পণ: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ছোট, অথচ চরম প্রতীকী ঘটনা আমাদের এই ভেতরের কদর্য রূপটাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ঘটনাটি স্রেফ একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, এটি একটি সামষ্টিক চারিত্রিক স্খলনের দলিল। একজন নারী ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে নিজের গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। একই রাস্তায় একটি পিকআপ ভ্যানে করে ডিম নিয়ে যাচ্ছিলেন এক চালক। সামনের কোনো এক যানজটে পড়ে ভ্যানটি যখনই ওই নারীর হাতের নাগালে এলো, তিনি মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ দেখে নিয়ে টুপ করে দুটি ডিম হাতিয়ে নিজের ব্যাগে রেখে দেন। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অপরাধবোধ নেই, যেন অতি স্বাভাবিক এক অধিকার তিনি খাটিয়ে নিলেন।


মোটা দাগে মনে হতেই পারে, এস আলমের লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংক লোপাট কিংবা শীর্ষ আমলা ও ব্যবসায়ীদের মেগা-দুর্নীতির তুলনায় দুটি ডিম হাতিয়ে নেওয়া এমন কী বড় ঘটনা! এই তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে এত আদিখ্যেতার কী আছে? কিন্তু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটাই আসলে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। ব্যাংকের টাকা চুরি বা রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করার সুযোগ সবার হয় না; তার জন্য একটা নির্দিষ্ট ক্ষমতার স্তরে পৌঁছাতে হয়, লবিং করতে হয়, প্রভাবশালী হতে হয়। কিন্তু এই যে জ্যামে আটকে থাকা ভ্যান থেকে দুটি ডিম তুলে নেওয়া — এটি দেখায় যে, আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের মজ্জায় মজ্জায় এখন সততার অভাব। সুযোগের অভাবে আমরা অনেকেই হয়তো সাধু সেজে বসে আছি, কিন্তু সামান্যতম সুযোগ পেলেই নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দিতে আমাদের এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। এই নারীর ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে আসলে আমাদের পুরো জাতিরাষ্ট্রের চারিত্রিক স্খলন নগ্নরূপে ধরা পড়েছে। আমরা আসলে প্রায় সবাই এখন এমন হয়ে গেছি।


শৈশবের হারিয়ে যাওয়া পাঠ ও আধুনিক শিক্ষার অন্তঃসারশূন্যতা: প্রশ্ন জাগে, আমাদের এই সামগ্রিক পতন কেন হলো? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার আর সমাজ কি তবে পুরোপুরি ব্যর্থ? শৈশবে আমরা যে পাঠ্যবই পড়ে বড় হয়েছি, সেখানে অত্যন্ত সহজ ভাষায় কিছু চিরন্তন সত্য ও মূল্যবোধ শেখানো হতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সেইসব অমর বাণী: “পরের হিত চিন্তা করিবে”, “অন্যের অনিষ্ট করিবে না”, “সদা সত্য কথা বলিবে”, “মিথ্যা বলা মহাপাপ”, কিংবা “অকারণে গাছের পাতা ছিঁড়িবে না”। এই আপ্তবাক্যগুলো শুধু পরীক্ষার খাতায় লিখে নম্বর পাওয়ার জন্য ছিল না; এগুলো ছিল একজন মানুষের মানবিক ও নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার হাতিয়ার।


কিন্তু আজ আমাদের শিক্ষকরা কি আর এসব শেখান? নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন কেবল জিপিএ-৫, সার্টিফিকেট আর কর্পোরেট বাজারের জন্য রোবট তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে? এখনকার জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবী সন্তানটি যখন বড় হয়ে রাষ্ট্রের কোনো বড় পদে বসে প্রথম সুযোগেই ঘুষ খাওয়া শুরু করে, তখন বুঝতে হবে তার শৈশবের শিক্ষার বুনিয়াদেই গলদ ছিল। আমরা তাকে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া শিখিয়েছি, কিন্তু মানুষ হওয়া শেখাইনি।


কাঠামোগত উন্নয়ন বনাম মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়: আজ আমাদের দেশে জেলায় জেলায় এত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ পর্যায়েও শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় ঝাঁ-চকচকে আধুনিক মসজিদ ও উপাসনালয় তৈরি হচ্ছে। আর অন্যদিকে, ইন্টারনেটের যুগে ইউটিউব ও ফেসবুক জুড়ে হাজারো মোটিভেশনাল স্পিকার, ধর্মীয় বক্তা ও সুশীলদের বয়ানের খই ফুটছে। প্রযুক্তির কল্যাণে জ্ঞান, উপদেশ এবং তত্ত্বের কোনো অভাব নেই আমাদের। কিন্তু সবচেয়ে বড় ও রূঢ় প্রশ্ন হলো — সেসবের শিক্ষা আসলে কোথায় যায়?


যদি প্রতিটা গলিতে একটা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয় থাকার পরেও মানুষের অবচেতন মন থেকে চুরির প্রবণতা, পরশ্রীকাতরতা, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা না করে নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি এবং অনৈতিকতা দূর না হয়, তবে বুঝতে হবে এই বিশাল কাঠামোগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আসলে অন্তঃসারশূন্য। শিক্ষা কেবল মাথায় তথ্যের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে এবং ডিগ্রি দিচ্ছে, কিন্তু মানুষের মন ও মননকে স্পর্শ করতে পারছে না। আমাদের সংস্কৃতি হয়ে পড়েছে কেবল উৎসব-কেন্দ্রিক ও চটকদার; জীবনের গভীরে, প্রতিদিনের আচরণে তার কোনো শিকড় বা প্রভাব নেই।


ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্ত ও ঘুণপোকার বিস্তার: আমরা এখন বাস করছি এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায়। আমাদের বুদ্ধিজীবী, সমাজচিন্তক, রাজনৈতিক কর্মী এবং আমজনতার সিংহভাগই ব্যস্ত ইতিহাস চর্চার চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে। কে কোন পক্ষের আর কে বিপক্ষের, কার আদর্শ খাঁটি আর কারটা ভেজাল, কোন দল স্বাধীনতার স্বপক্ষের আর কে বিপক্ষের — এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক দলবাজি ঠিক রাখতেই আমাদের সব মেধা ও শক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের জন্য ইতিহাস জানা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমান যখন চোখের সামনে ধসে পড়ছে, তখন কেবল অতীত নিয়ে অন্তহীন কামড়াকামড়ি করা এক ধরনের পলায়নপরতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব।


আমরা যখন ওপরের স্তরে পক্ষ-বিপক্ষের অবিনাশী লড়াইয়ে মত্ত, তখন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের একদম তলদেশ দিয়ে ঘুণপোকা ঢুকে সবকিছু কেটে কুটি কুটি করে দিয়ে যাচ্ছে। সেই খবর কেউ রাখছি না। শিক্ষা ও সংস্কৃতির এই যে মৌলিক গলদ, যা প্রতিদিন একজন সাধারণ নাগরিককে চোর বা দুর্নীতিবাজ বানিয়ে তুলছে, এর মূল উৎস কোথায়, তা কেউ তলিয়ে দেখছে না। আমরা উপরিভাগের ডালপালা ছাঁটতে ব্যস্ত, অথচ গাছের গোড়ায় যে মড়ক লেগেছে, সেদিকে কারও নজর নেই।


ক্ষুদ্র অপরাধের বৃহৎ ভবিষ্যৎ: একটি রাষ্ট্র তখনই ভেঙে পড়ে না যখন তার অর্থনীতি দুর্বল হয়; রাষ্ট্র তখনই ধ্বংসের মুখে পড়ে যখন তার নাগরিকদের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আজ আমরা যে ‘নষ্টদের অধিকারের’ কথা বলছি, সেই নষ্টরা কিন্তু কোনো ভিনগ্রহ থেকে রকেট বা স্পেসশিপে চড়ে আসেনি। তারা আমাদের এই সমাজ, আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা এবং আমাদের এই পারিবারিক বলয় থেকেই তৈরি হয়েছে।


আজ যে নারী রিকশায় বসে স্রেফ দুটো ডিম হাতিয়ে নেওয়ার লোভ সামলাতে পারলেন না, সুযোগ ও ক্ষমতা পেলে তিনি যে ব্যাংকের ভল্ট খালি করবেন না, কিংবা কোনো সরকারি প্রজেক্টের কোটি টাকা আত্মসাৎ করবেন না — তার গ্যারান্টি কে দেবে? একইভাবে, আজ ক্ষমতার শীর্ষে বসে যারা হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছেন, তারাও হয়তো একসময় এই সমাজেরই কোনো এক স্তরে ছোটখাটো নৈতিক স্খলনের মধ্য দিয়ে, পরীক্ষার খাতায় নকল করে কিংবা ছোট-খাট কোনো চুরির মাধ্যমে তার অনৈতিকতার হাতেখড়ি করেছিলেন। ক্ষুদ্র অপরাধের এই ধারাবাহিকতাই একসময় সমাজকে বড় বড় অপরাধী ও সমাজবিরোধীদের চারণভূমিতে পরিণত করে।


উত্তরণের পথ ও আমাদের দায়: তাই সন্তানকে কেবল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিসিএস ক্যাডার বানিয়ে ‘মানুষের মতো মানুষ’ করার মেকি স্বপ্ন দেখার আগে আমাদের সমাজকে নতুন করে সাজাতে হবে। কেবল কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উপার্জন করা, দামি গাড়ি চড়া বা বড় সামাজিক স্ট্যাটাস অর্জন করাই যদি সফলতার একমাত্র মাপকাঠি হয়, তবে এই সমাজ আরও দ্রুত গতিতে নষ্টদের দখলে চলে যাবে। আমাদের এখন প্রয়োজন এক গভীর, আমূল শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক জাগরণ। এমন এক সামাজিক আন্দোলন, যা মানুষকে অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখাবে, যা লোভের চেয়ে আত্মমর্যাদাকে এবং অন্যায়ের প্রতি আপসহীনতাকে বড় করে দেখতে শেখাবে।


ইতিহাসের পোস্টমর্টেম ও ক্ষণস্থায়ী দলবাজির ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ক্ষুদ্রতম নৈতিকতার চর্চাকে ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো আলো আসলেই আর অবশিষ্ট থাকবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ পরিবর্তন কোনো উপরিকাঠামোর বিষয় নয়; এর শুরুটা হয় নিজের ভেতরের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে।


উপসংহার- অন্তরের আলো ও পারিবারিক জাগরণ: পরিশেষে বলা যায়, আমাদের চারপাশের এই তীব্র নৈতিক সংকট এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির গলদ কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের দরকার সামগ্রিক চিন্তা-চেতনার আমূল পরিবর্তন। কেবল আইনের কঠোরতা কিংবা কাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে একটি ভঙ্গুর জাতিকে টেনে তোলা সম্ভব নয়। আমাদের ভেতরকার সুপ্ত চেতনাবোধ, নীতি-নৈতিকতা, মজ্জাগত সততা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যদি নতুন করে জাগরিত না হয়, তবে এই সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা সারানো সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠবে।


আমাদের দৈনন্দিন অস্থিরতা, সীমাহীন লিপ্সা, পরচর্চা আর পরনিন্দার মতো ব্যাধিগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজকে ভেতরে-ভেতরে বিষিয়ে তুলছে। এই বিষাক্ত বৃত্ত থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো পরিবর্তনের সুঁই-সুতোটা নিজের ঘর থেকেই চালানো। রাষ্ট্র বা সমাজের বড় বড় সংস্কারের আশায় বসে না থেকে, ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে এই মুহূর্তে নীতি-নৈতিকতাকে সবার উপরে স্থান দেওয়া দরকার। সন্তানকে জিপিএ-৫ কিংবা লোভনীয় ক্যারিয়ারের মন্ত্র গেলানোর আগে ‘মানুষের মতো মানুষ’ হওয়ার পাঠ দিতে হবে; শেখাতে হবে অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মানবোধ। নতুবা এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজকে কোনোভাবেই পাল্টানো যাবে না। এই মহাসংকটে দাঁড়িয়ে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক স্তরে নিজেদের নৈতিক পরিবর্তনটি আনাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।


নিকোলাস বিশ্বাস একজন ডেভেলপমেন্ট প্র্যাক্টিশনার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

সম্পর্কিত খবর

;