সোমবারের রুশ হামলায় কিয়েভের হাজার বছরের মঠে আগুন, নিহত অন্তত ১১

প্রকাশ : 16 Jun 2026
সোমবারের রুশ হামলায় কিয়েভের হাজার বছরের মঠে আগুন, নিহত অন্তত ১১

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সোমবার ভোররাতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ কয়েকটি বড় শহরে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এ হামলায় সারাদেশে অন্তত ১১ জন নিহত এবং ৫৩ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। নিহতদের মধ্যে কিয়েভে রয়েছেন পাঁচজন। খারকিভে দমকলকর্মীদের লক্ষ্য করে চালানো ‘ডাবল ট্যাপ’ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন উদ্ধারকর্মী। 


হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল কিয়েভ। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়া মোট ৭০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬১১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে ৬০টি ক্ষেপণাস্ত্র কেবল রাজধানীর দিকেই ছোড়া হয়। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী ৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৮২টি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ৩৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র ১৫টি প্রতিহত করা গেছে। 


সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে কিয়েভ পেচেরস্ক লাভরা মঠ কমপ্লেক্সে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানটির ১১ শতকের ডরমিশন ক্যাথেড্রালের ছাদে আগুন ধরে যায়। ভোররাতে বিকট বিস্ফোরণের পর ক্যাথেড্রালের গম্বুজ থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। দমকল বাহিনীর প্রায় ২০টি ইউনিট ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সকাল ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কিয়েভ সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তাকাচেঙ্কো জানান, মঠে ‘সরাসরি আঘাত’ হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। 


প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে ‘খ্রিস্টান সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এটি কেবল আমাদের জনগণের ওপর নয়, আমাদের ঐতিহ্যের ওপরও বর্বর আক্রমণ। প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কো এক্স-এ লিখেছেন, সরকার রিজার্ভ তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করে জরুরিভিত্তিতে ছাদ মেরামত ও পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। 


এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, হামলার পুরো সময় কিয়েভের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার শব্দ শোনা গেছে। বাসিন্দারা রাস্তায় ছুটে আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। শহরের বিভিন্ন স্থানে জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ পড়েছে। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, হামলায় অন্তত ১ লাখ ৪০ হাজার বাসিন্দা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। আবাসিক ভবন, মার্কেট ও মিস্তেতস্কি আর্সেনাল আর্ট মিউজিয়ামেও আগুন লেগেছে। 


রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য দাবি করেছে, তারা মঠ লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। মস্কোর ভাষ্য, ইউক্রেনের মার্কিন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ত্রুটির কারণে লাভরার ভবনে আঘাত লেগেছে। রাশিয়া বলছে, তাদের লক্ষ্য ছিল সামরিক কারখানা। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে রুশ জেরান-২ ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। 


১০৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত কিয়েভ পেচেরস্ক লাভরা পূর্ব অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের অন্যতম পবিত্র স্থান। ২০২৩ সালে ইউক্রেন সরকার মস্কোপন্থী যাজকদের এ স্থান থেকে সরিয়ে দেয়। ২০২৩ সালেই ইউনেস্কো এটিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য বিপদাপন্ন’ তালিকায় যুক্ত করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা লুক্সেমবার্গে বৈঠকে এ হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে নিন্দা করেছেন এবং রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন। 


মঠের ভাইসর বিশপ আভ্রামি জানান, হামলার পরপরই বৃষ্টি শুরু হয়। ‘প্রথমে শান্ত বৃষ্টি ছিল, পরে আগুন বাড়ার সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। আমরা এটাকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছি।’ সোমবার দুপুরে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নিজে মঠ পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতি দেখেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সবচেয়ে মূল্যবান ধর্মীয় নিদর্শন সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তবে ছাদ মারাত্মকভাবে পুড়েছে। 




সম্পর্কিত খবর

;