হরমুজ প্রণালি খুলছে

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই

প্রকাশ : 18 Jun 2026
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং সই হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে উভয় দেশের সরকারি সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।


হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বুধবার সাংবাদিকদের জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন। হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে আয়োজিত এক নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প "ইরান সমঝোতা স্মারক" শিরোনামের নথিতে সই করছেন। ওই সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও ব্রিজিত ম্যাক্রোঁ উপস্থিত ছিলেন। হোয়াইট হাউসের ক্যাপশনে বলা হয়, ভার্সাইয়ে ইরান সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। 


ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরনাকে জানান, সমঝোতা স্মারকের পাঠ্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের সইয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছে। আল জাজিরা জানায়, দুই পক্ষ নথিতে ইলেকট্রনিকভাবে সই করেছে। বাঘায়ি বলেন, এখন সময় এই চুক্তির বাস্তবায়ন পরীক্ষা করার। রয়টার্সও নিশ্চিত করেছে, ইরানের বাঘায়ি বলেছেন যে চুক্তির পাঠ্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের দ্বারা সই হয়েছে। 


হোয়াইট হাউস বুধবার ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য প্রকাশ করে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নথিতে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা রয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতাকে সম্মান জানাবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে বলে অঙ্গীকার করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যাবে। 


সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। রয়টার্স জানায়, ৬০ দিনের আলোচনা পর্ব শুরু হচ্ছে, যার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিনা টোলে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। চুক্তি অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালি দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় চলাচল পুনরুদ্ধার করতে হবে। ওয়াশিংটন এক্সামিনার জানায়, নথি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালি "অবিলম্বে" খুলে যাওয়ার কথা, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ কমাবে। 


চুক্তির ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। প্রাসঙ্গিক আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স, ছাড় ও অনুমতি যুক্তরাষ্ট্র দেবে। মার্কিন দৈনিক ডেইলি কলারকে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এই ধারায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানকে সরাসরি অর্থ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না। বরং ইরান ভালো আচরণ করলে, উদাহরণস্বরূপ আমিরাত ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চাইলে, যুক্তরাষ্ট্র সেই বিনিয়োগের অনুমতি দেবে। 


পারমাণবিক ইস্যুতেও সমঝোতা স্মারকে বিধান রাখা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। দুই দেশ এ বিষয়ে আলোচনা করবে, যার মধ্যে সমৃদ্ধকরণের বিষয়টিও রয়েছে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিষ্পত্তির জন্য পারস্পরিকভাবে সম্মত একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনকে জানান, চুক্তিতে "ন্যূনতম পদ্ধতি" হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রার উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে নিষ্ক্রিয় করার কথা বলা হয়েছে। 


চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুক্রবার হওয়ার কথা থাকলেও ইলেকট্রনিক সইয়ের কারণে তা বাতিল করা হয়েছে বলে জানান বাঘায়ি। তবে আলোচনাকারী দলগুলো সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে জড়ো হওয়ার পরিকল্পনা করছে। সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বুর্গেনস্টককে স্থান হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। 


চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ওয়াশিংটন এক্সামিনার জানায়, রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এই চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, এটি তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধে ব্যর্থ। অন্যদিকে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও ইরানের সঙ্গে শত্রুতা বন্ধের দিক থেকে এমওইউ সই করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপকারী হবে। আল জাজিরার সংবাদদাতা মাইক হানা জানান, প্রশাসন এই স্মারককে চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং আরও আলোচনার পূর্বসূচনা হিসেবে বর্ণনা করছে। 


জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিতসু এক বিবৃতিতে এই সমঝোতা স্মারককে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি পরিস্থিতি সমাধানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তবে ৮ এপ্রিল থেকে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছিল। নতুন এই সমঝোতা স্মারক সেই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানোর কাঠামো তৈরি করল। 


সম্পর্কিত খবর

;