মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ল তেলের দাম

প্রকাশ : 16 Jul 2026
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ল তেলের দাম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে টানা চতুর্থ দিনের মতো তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায় বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


বার্তাসংস্থা রয়টার্স ও আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বুধবার রাতে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সেন্টকম এক্স-এ জানিয়েছে, গ্রেটার টুনব দ্বীপে ৯০ মিনিটের হামলায় ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা আরও কমানো হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও নৌযান হরমুজ প্রণালি ও ইরানের উপকূলীয় এলাকায় ‘ডজন ডজন’ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরগুলোর নৌ-অবরোধ পুনরায় চালু করে। 


ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, কেশম, হেনগাম, সিরিক ও বুশেহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহরাইনের জুফায়ের ঘাঁটি, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও ওমানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। 


হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ওমানের জলসীমায় থাকা আমিরাতের দুটি তেল ট্যাংকার মোম্বাসা ও আল বাহিয়াকে আঘাত করেছে। এতে একজন ভারতীয় ক্রু নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। ইরান জাহাজ দুটিকে ‘অপরাধী সুপারট্যাংকার’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় তারা ‘মাইনযুক্ত রুট’ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ফলে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। 


সংঘাতের প্রভাবে বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচারের দাম ৩৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ফিউচারের দাম ৪২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ০২ ডলারে পৌঁছেছে। এর আগে বুধবার ব্রেন্ট ২৪ সেন্ট কমে ৮৪ দশমিক ৯৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ১৫ সেন্ট কমে ৭৯ দশমিক ৪৫ ডলারে নামলেও সপ্তাহজুড়ে দাম এক মাসের সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি রয়েছে। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ায় এবং ইরান প্রণালি বন্ধের হুমকি দেওয়ায় বাজারে ঝুঁকি প্রিমিয়াম যোগ হয়েছে। গত ৭ জুলাই থেকে দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জাহাজ চলাচলে অবরোধ পুনর্বহাল করেছেন এবং প্রণালি খোলা রাখতে ২০ শতাংশ ফি আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। 


ভারতের গণমাধ্যম ইন্ডিয়া হেরাল্ড জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের টানা সাত ঘণ্টার হামলায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি হুমকির মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 


বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। তবে গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প পাইপলাইন সক্ষমতা বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬০ শতাংশের বেশি তেল রপ্তানি প্রণালির বাইরে দিয়ে করা সম্ভব হবে। আপাতত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তেলের বাজারকে সমর্থন দিচ্ছে, তবে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করছেন। 


সম্পর্কিত খবর

;