ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে শান্তি-আলোচনা স্থগিত করল ইরান, ছন্দপতনে বিশ্ব

প্রকাশ : 22 Jun 2026
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে শান্তি-আলোচনা স্থগিত করল ইরান, ছন্দপতনে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর সুইজারল্যান্ডের বুরগেনস্টকে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা থেকে বেরিয়ে গেছে ইরানি প্রতিনিধিদল। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্পের হুমকির প্রতিবাদে আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, আলোচনা আবার শুরু হবে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এর পর কী ঘটে সেদিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।


ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান দরকষাকষিকারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “ওরা বক্তব্যে সাবধান হোক। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ভিন্নভাবে জবাব দিতে প্রস্তুত। ওরা যা-ই বলুক, কাজ আমরাই করব।” গত রোববার ২১ জুন আলপাইন রিসোর্ট বুরগেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল এবং ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছিল। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে এই বৈঠক হচ্ছিল।


আলোচনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, “ইরানকে অবশ্যই লেবাননে তাদের অতি বেতনভোগী প্রক্সিদের ঝামেলা বন্ধ করতে হবে। না হলে আমরা গত সপ্তাহের চেয়েও কঠোরভাবে ইরানে আঘাত হানব।” তিনি আরও বলেন, “তোমরা স্ট্রেইট বন্ধ করবে। না হলে তোমাদের দেশ বলে কিছু থাকবে না। তোমরা তোমাদের বাজে দেশে ফিরতেও পারবে না।” একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ হিসেবে টোল আদায় করবে।


ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই ইরানি প্রতিনিধিদল আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে যায়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এর আগে বলেছিলেন, ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাই আজকের আলোচনার মূল বিষয়। কারণ ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চুক্তি ভঙ্গ করায় তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।


আলোচনার শুরুতে অবশ্য ভিন্ন চিত্র ছিল। ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, “মাত্র কয়েক ঘণ্টায় আমরা দারুণ অগ্রগতি করেছি। আগামী কয়েক ঘণ্টায় আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা করছি।” তিনি আরও বলেন, ইরান যদি অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড বন্ধ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নতুন পাতা’ উল্টাতে প্রস্তুত। তবে ট্রাম্পের হুমকির পর পরিস্থিতি বদলে যায়।


রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে। এতে বিশ্বের তেল সরবরাহের পঞ্চমাংশ হুমকিতে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড অবশ্য দাবি করেছে, শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে এবং মার্কিন বাহিনী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করবে।


দ্য ন্যাশনাল জানিয়েছে, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে শর্ত ছিল ইরানকে পুরোপুরি বদলাতে হবে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প ইরানকে তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়ার কথাও ভাবছেন। কিন্তু লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের লড়াই চলতে থাকায় পুরো চুক্তিই এখন অনিশ্চিত।


আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরান বলছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করা যায় না। প্রধান দরকষাকষিকারী গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনো চুক্তি হবে না। তিনি আরও বলেন, “লেবানন এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গা। কারণ এটি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”


ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও ইরানের প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বুরগেনস্টকের বিলাসবহুল হোটেলের বাইরে কাঁটাতারের বেড়া, কংক্রিটের ব্লক আর সাবমেশিনগান হাতে নিরাপত্তারক্ষীরা অবস্থান নিয়েছে। আলোচনা ভেস্তে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকে নজর রাখছে বিশ্ব।


সম্পর্কিত খবর

;